জমি থেকে সিঙ্গল উইন্ডো, শ্রম সমস্যা থেকে পরিবহণ—শিল্পপতিদের একের পর এক প্রস্তাব নথিবদ্ধ করল রাজ্য সরকার, মুখ্যমন্ত্রীর কাছে যাবে চূড়ান্ত রিপোর্ট
ভারত নিউজ ২৪*৭
কলকাতা: শিল্পে বিনিয়োগ টানতে এবার কি বদলাতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গের নীতি? নতুন শিল্পনীতির রূপরেখা চূড়ান্ত করার আগে শিল্পপতি, ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন বণিকসভাকে একেবারে সামনে বসিয়ে তাঁদের সমস্যার কথা শুনল রাজ্য সরকার। নবান্নে দীর্ঘ প্রায় তিন ঘণ্টার বৈঠকে উঠে এল জমি, ইনসেন্টিভ, সিঙ্গল উইন্ডো, শ্রম এবং পরিবহণ—শিল্পমহলের একাধিক বাস্তব সমস্যা।
পশ্চিমবঙ্গে প্রথম বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী [Suvendu Adhikari] ঘোষণা করেছিলেন, রাজ্যে শিল্প ও বিনিয়োগের পরিবেশ আরও শক্তিশালী করতে তৈরি হবে নতুন শিল্পনীতি [West Bengal New Industry Policy]। সেই ঘোষণার পর এবার নীতির ভিত তৈরির কাজ কার্যত শুরু করে দিল সরকার।
মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে ইতিমধ্যেই গঠিত হয়েছে শিল্প সংক্রান্ত বিশেষ মন্ত্রীগোষ্ঠী। সেই মন্ত্রীগোষ্ঠীই মঙ্গলবার নবান্ন সভাঘরে [Nabanna] দেশের প্রথম সারির শিল্পপতি ও বিভিন্ন বণিকসভার প্রতিনিধিদের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করে।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী তাপস রায় [Tapas Roy], শ্রম ও পরিবহণমন্ত্রী অর্জুন সিং [Arjun Singh], অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত [Swapan Dasgupta], পর্যটনমন্ত্রী শংকর ঘোষ [Shankar Ghosh], মুখ্যসচিব মনোজ কুমার আগরওয়াল [Manoj Kumar Agarwal] সহ বিভিন্ন দফতরের সচিব এবং উচ্চপদস্থ আধিকারিকরা।
শিল্পপতিদের মুখেই শুনল সরকার সমস্যার কথা
নতুন শিল্পনীতি তৈরি করার আগে শিল্পমহলের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করাকেই বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে রাজ্য। শিল্পমন্ত্রী তাপস রায়ের বক্তব্য, যাঁরা বাস্তবে শিল্প গড়বেন, তাঁদের সমস্যার কথা তাঁদের কাছ থেকেই শোনা দরকার।
বৈঠক শেষে শিল্পমন্ত্রী জানান, আলোচনা ছিল ইতিবাচক এবং প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে চলেছে। শিল্পপতি, ব্যবসায়ী নেতা এবং উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে একের পর এক মতামত নেওয়া হয়েছে।
তাঁর কথায়, শিল্পক্ষেত্রে ঠিক কোথায় সমস্যা হচ্ছে, কোন সুযোগ-সুবিধার অভাব রয়েছে এবং বিনিয়োগকারীদের কী কী প্রয়োজন—সেই বিষয়গুলি তাঁরা সরাসরি তুলে ধরেছেন। শুধু শোনাই নয়, সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলি নথিবদ্ধও করা হয়েছে।
অর্থাৎ এবার শুধু নীতির ঘোষণা নয়, শিল্পমহলের বাস্তব অভিজ্ঞতাকেই নতুন শিল্পনীতির অন্যতম ভিত্তি করার চেষ্টা করছে সরকার।
জমি অধিগ্রহণে ‘স্বচ্ছতা’, বার্তা সরকারের
তবে শিল্পায়নের পথে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলির একটি—জমি। পশ্চিমবঙ্গে শিল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ অতীতে বড় রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সেই অভিজ্ঞতার কথা মাথায় রেখেই নতুন সরকারের সামনে এই বিষয়টি বড় চ্যালেঞ্জ।
জমি নিয়ে প্রশ্নের উত্তরে শিল্পমন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন, শিল্পের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে রাজ্যের মানুষের বিশ্বাসে আঘাত করে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। জমি সংক্রান্ত পদক্ষেপে স্বচ্ছতা এবং ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখার বার্তাই দিয়েছে সরকার।
সিঙ্গল উইন্ডো থেকে শ্রম সমস্যা—উঠল একাধিক ইস্যু
বৈঠকে শিল্পপতিদের আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জমির পাশাপাশি ইনসেন্টিভ বা আর্থিক সুবিধা, সিঙ্গল উইন্ডো ব্যবস্থার কার্যকারিতা, শ্রম সংক্রান্ত সমস্যা এবং পরিবহণ ব্যবস্থার বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কথাও সামনে এসেছে।
শ্রম ও পরিবহণমন্ত্রী অর্জুন সিং বলেন, সমস্যা শুধু জমিতে আটকে নেই। শিল্পের জন্য জমি থাকলেও তার পরবর্তী ধাপে ইনসেন্টিভ, প্রশাসনিক অনুমোদন, শ্রম এবং পরিবহণ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাস্তব সমস্যা রয়েছে।
তিনি জানান, বিভিন্ন চেম্বার ও বণিকসভা নিজেদের মতো করে একাধিক প্রস্তাব দিয়েছে। ছোট থেকে বড়—বিভিন্ন স্তরের ব্যবসায়িক প্রতিনিধিরাই আলোচনায় অংশ নিয়ে নিজেদের মতামত জানিয়েছেন।
এখন সেই সমস্ত প্রস্তাব খতিয়ে দেখে ফের আলোচনা করবে বিশেষ মন্ত্রীগোষ্ঠী। এরপর তৈরি হবে রিপোর্ট। সেই রিপোর্টই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হবে।
শিল্পে বিনিয়োগ টানতে এবার কী বদল?
নতুন শিল্পনীতি ঘিরে তাই প্রত্যাশা বাড়ছে শিল্পমহলে। জমি, অনুমোদন, ইনসেন্টিভ, শ্রম এবং পরিবহণ—বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘদিনের একাধিক প্রশ্নের সমাধান কতটা বাস্তবসম্মতভাবে নীতিতে জায়গা পায়, সেটাই এখন বড় পরীক্ষা।
নবান্নের এই বৈঠক নিছক আর পাঁচটা প্রশাসনিক বৈঠক নয়—শিল্পনীতির চূড়ান্ত কাঠামো তৈরির আগে শিল্পমহলের সঙ্গে সরকারের সরাসরি মতবিনিময় হিসেবে এর গুরুত্ব যথেষ্ট।
এখন নজর সেই রিপোর্টের দিকে। শিল্পপতিদের প্রস্তাবের কতটা নতুন শিল্পনীতিতে জায়গা পাবে, আর সেই নীতিই বা বাংলায় বিনিয়োগের ছবিটা কতটা বদলাতে পারবে—এবার আসল প্রশ্ন, নবান্নের এই বৈঠকের পর বাংলার শিল্প মানচিত্রে সত্যিই কি বড় পরিবর্তন আসতে চলেছে?















































