১৯ বছর পর কলকাতায় ফিরে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, বাংলাদেশের রাজনীতি, সংখ্যালঘু অধিকার ও ছাত্র আন্দোলন—এক মঞ্চে একাধিক বিতর্কিত ইস্যুতে সরব তসলিমা নাসরিন।
ভারত নিউজ ২৪*৭
প্রায় দুই দশক পর কলকাতার মাটিতে ফিরে আবারও বিতর্কের কেন্দ্রে তসলিমা নাসরিন [(Taslima Nasrin)]। আর ফিরেই এমন কিছু মন্তব্য করলেন, যা ঘিরে রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হওয়া অস্বাভাবিক নয়। বাংলাদেশের [(Bangladesh)] ছাত্র আন্দোলন প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্যই এখন সবচেয়ে বেশি চর্চার বিষয়।
তসলিমার দাবি, বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের আড়ালে উগ্রপন্থী শক্তি সক্রিয় ছিল এবং সেই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করা হয়েছিল। তাঁর মতে, কোনও আন্দোলনকে শুধুমাত্র আবেগের দৃষ্টিতে বিচার করা উচিত নয়; বরং তার নেপথ্যের শক্তি ও উদ্দেশ্যও সমানভাবে খতিয়ে দেখা দরকার।
এই মন্তব্যের পাশাপাশি বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও তীব্র সমালোচনা করেন নির্বাসিত এই লেখিকা। তাঁর বক্তব্য, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন পূর্ববর্তী সরকার এবং বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে মৌলিক নীতিগত পরিবর্তন তিনি দেখতে পাচ্ছেন না। তাঁর অভিযোগ, সরকার পরিবর্তন হলেও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার প্রশ্নে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি দেখা যায়নি।
বিশেষ করে বাংলাদেশের [(Bangladesh)] হিন্দু সম্প্রদায় এবং হিন্দু নারীদের অধিকার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তসলিমা। তাঁর দাবি, বহু ক্ষেত্রেই হিন্দু নারীরা সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হন এবং সামাজিক বৈষম্যের শিকার হন। একই সঙ্গে তিনি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নিয়ে বলেন, ভারতের [(India)] মুসলিম নারীরাও বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্যের মুখোমুখি হন। তাই নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করাই তাঁর দীর্ঘদিনের আন্দোলনের মূল লক্ষ্য।
ধর্ম ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়েও নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন তসলিমা। তাঁর মতে, রাষ্ট্র এবং ধর্মকে সম্পূর্ণ আলাদা রাখা উচিত। তিনি বলেন, ধর্মের প্রভাব যখন প্রশাসন বা রাজনীতির ওপর বাড়তে থাকে, তখন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
একই প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন, কিছু মাদ্রাসায় উগ্রপন্থী মতাদর্শের বিস্তার এবং শিশু নির্যাতনের অভিযোগ সামনে এসেছে। তবে তিনি স্পষ্ট করে জানান, এই মন্তব্য কোনওভাবেই সব মাদ্রাসাকে লক্ষ্য করে নয়; বরং নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ভিত্তিতেই তিনি এই উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।
ছাত্র আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি আরও বলেন, প্রত্যেক ছাত্র আন্দোলন যে ইতিবাচক ফলই বয়ে আনবে, এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। কোনও আন্দোলনের প্রকৃত চরিত্র বোঝার জন্য তার নেপথ্যের শক্তি, নেতৃত্ব এবং উদ্দেশ্য বিশ্লেষণ করা জরুরি বলেও মত দেন তিনি।
কলকাতায় ফিরে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়েও সরব হন তসলিমা। তাঁর বক্তব্য, কাউকে নিজের মত প্রকাশ থেকে বঞ্চিত করা গণতন্ত্রের চেতনাবিরোধী। তিনি বলেন, ভিন্নমত থাকতেই পারে, কিন্তু সেই মত প্রকাশের অধিকার কেড়ে নেওয়া কোনও গণতান্ত্রিক সমাজের পক্ষে শুভ নয়।
এই প্রসঙ্গেই তিনি কবি জয় গোস্বামী [(Joy Goswami)]-র পাশে দাঁড়িয়ে বলেন, তাঁকে অসম্মান করা মানে তাঁকেও অসম্মান করা। তসলিমার দাবি, জয় গোস্বামীকে অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানোর উদ্যোগ তাঁরই ছিল এবং প্রয়োজনে তিনি ব্যক্তিগতভাবে গিয়েও তাঁর সঙ্গে দেখা করবেন।
নিজের নির্বাসনের প্রসঙ্গও তুলে আনেন তিনি। তসলিমার বক্তব্য, এক সময় একটি সরকার তাঁকে পশ্চিমবঙ্গে থাকতে দেয়নি, আবার অন্য একটি সরকার কলকাতায় ফিরে আসার সুযোগ করে দিয়েছে। তবে তিনি স্পষ্ট করেন, কোনও রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্য নয়, তাঁর অবস্থান সবসময় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং মানবাধিকারের পক্ষে।
শেষে তিনি বলেন, গণতন্ত্রের আসল শক্তি হলো মানুষের নির্ভয়ে কথা বলার অধিকার। মতের অমিল থাকতে পারে, কিন্তু সেই মত প্রকাশের সুযোগই একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি তৈরি করে।
কলকাতায় ফিরে তসলিমা নাসরিনের এই ধারাবাহিক মন্তব্য ইতিমধ্যেই নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলন থেকে শুরু করে সংখ্যালঘু অধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা—একাধিক স্পর্শকাতর বিষয়ে তাঁর অবস্থান আগামী দিনে রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনাকে কোন দিকে নিয়ে যাবে, এখন সেদিকেই নজর সকলের।

















































