ডিজিটাল সেনসাস, নাগরিক তালিকা, সিএএ ও শরণার্থী ইস্যু— এক মঞ্চ থেকে একাধিক বড় ঘোষণা। বিরোধীদের নিশানায় রেখে সরব মুখ্যমন্ত্রী।
ভারত নিউজ ২৪*৭
ডিজিটাল জনগণনার সূচনাতেই রাজনৈতিক বারুদের গন্ধ। প্রশাসনিক কর্মসূচির মঞ্চ মুহূর্তে বদলে গেল রাজনৈতিক বার্তার কেন্দ্রে। আর সেখান থেকেই অবৈধ অনুপ্রবেশ, নাগরিকত্ব, শরণার্থী ও সরকারি সুবিধা নিয়ে একের পর এক কড়া মন্তব্য করলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)।
শনিবার বাংলায় আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হল সম্পূর্ণ ডিজিটাল জনগণনা (Digital Census West Bengal)। সেই কর্মসূচিতে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের রাজ্যে থাকার কোনও সুযোগ থাকবে না। তাঁর দাবি, পরিচয় ও নথি যাচাইয়ের পর যাঁরা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত হবেন, তাঁদের আইনি প্রক্রিয়া মেনে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে।
শুভেন্দুর কথায়, “একজনও অবৈধ অনুপ্রবেশকারী থাকবে না। তাঁদের জন্য সরকারি সম্পদ ব্যয় করা সম্ভব নয়। দেশের নাগরিকদের অধিকার আগে নিশ্চিত করতে হবে।” এই মন্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক মহলে ইতিমধ্যেই আলোচনা শুরু হয়েছে।
তবে একইসঙ্গে তিনি শরণার্থী ও অনুপ্রবেশকারীর মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্যের কথাও তুলে ধরেন। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA)-এর আওতায় হিন্দু, শিখ, খ্রিস্টান, জৈন, বৌদ্ধ ও পারসি সম্প্রদায়ের নির্দিষ্ট যোগ্য ব্যক্তিরা শরণার্থী হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন। তাঁদের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় আইনের বিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, প্রতিবেশী দেশ থেকে এ রাজ্যে আসা সকলকে একই চোখে দেখা যাবে না। প্রশাসনের কাজ হবে নথি ও তথ্য যাচাই করে প্রকৃত শরণার্থী এবং অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের আলাদা করা। সেই প্রক্রিয়ায় কোনও তাড়াহুড়ো নয়, বরং তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্তই হবে মূল লক্ষ্য।
ডিজিটাল জনগণনা প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী জানান, এবার সম্পূর্ণ প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থায় তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। নাগরিকরা প্রথম পর্যায়ে অনলাইনে নিজেদের তথ্য জমা দিতে পারবেন। এরপর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গণনাকারীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে সেই তথ্য যাচাই করবেন।
প্রশাসনের দাবি, এই নতুন পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ আরও দ্রুত, নির্ভুল ও স্বচ্ছ হবে। কাগজের ব্যবহারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। বিশেষ মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্য সরাসরি কেন্দ্রীয় সার্ভারে আপলোড করা হবে।
এবারের জনগণনায় নাগরিকদের ব্যক্তিগত পরিচয়, পরিবারের সদস্য সংখ্যা, শিক্ষা, পেশা, বাসস্থানের তথ্য-সহ মোট ৩৩টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। পাশাপাশি প্রথমবারের মতো জাতিভিত্তিক তথ্য সংগ্রহেরও ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
শুভেন্দুর দাবি, একবার এই তথ্যভান্ডার তৈরি হয়ে গেলে ভবিষ্যতে বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের সুবিধা নিতে বারবার একই নথি জমা দেওয়ার প্রয়োজন কমে যাবে। সামাজিক প্রকল্প, বিভিন্ন শংসাপত্র কিংবা অন্যান্য সরকারি পরিষেবার ক্ষেত্রেও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া আরও সহজ হবে বলে তাঁর মত।
বক্তব্যে তিনি পূর্ববর্তী সরকারের সমালোচনাও করেন। তাঁর অভিযোগ, জনগণনার প্রস্তুতি সময়মতো শুরু হয়নি বলেই বহু প্রশাসনিক কাজ দীর্ঘদিন পিছিয়ে ছিল। বর্তমান সরকার সেই ঘাটতি পূরণে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে বলে দাবি করেন তিনি।
এদিন এসআইআর (SIR) তালিকায় বিবেচনাধীন নাম নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। মুখ্যমন্ত্রী জানান, এই বিষয়ে নির্দিষ্ট নির্দেশিকা রয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য আইন অনুযায়ী প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে। তিনি বলেন, বহু মানুষ ইতিমধ্যেই ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেছেন, আবার অনেক ক্ষেত্রে কোনও প্রতিক্রিয়াও আসেনি। সব ক্ষেত্রেই আইনি কাঠামো মেনেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ডিজিটাল জনগণনার সূচনার দিনেই নাগরিকত্ব, শরণার্থী, অনুপ্রবেশ এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধার মতো স্পর্শকাতর ইস্যু সামনে এনে শুভেন্দু অধিকারী আসন্ন রাজনৈতিক লড়াইয়ের বার্তাও স্পষ্ট করে দিলেন। প্রশাসনিক কর্মসূচির পাশাপাশি এই মন্তব্য আগামী দিনে রাজ্যের রাজনৈতিক বিতর্ককে আরও তীব্র করতে পারে বলেই মত অনেকের।
এখন নজর একটাই—ডিজিটাল জনগণনার তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই প্রক্রিয়া এগোতে থাকলে এই বিতর্ক কোন দিকে মোড় নেবে? প্রশাসনিক উদ্যোগের পাশাপাশি রাজনৈতিক লড়াইও কি আরও তীব্র হবে? আগামী কয়েক সপ্তাহেই তার উত্তর মিলতে পারে।

















































