অভয়ার মায়ের বক্তব্যে আবেগপ্রবণ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, শ্মশানে দাহ প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর অভিযোগ তুলে রাজ্য পুলিশের তদন্তের নির্দেশ
ভারত নিউজ ২৪*৭
৯ অগস্ট। আরজি কর-কাণ্ডের সেই ভয়াবহ রাতের দুই বছর পূর্ণ। কিন্তু ক্ষত এখনও শুকোয়নি। বরং দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির দিনেই ফের উত্তাল হয়ে উঠল ‘অভয়া’-র ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। আর সেই স্মরণসভায় আবেগ সামলাতে পারলেন না মুখ্যমন্ত্রী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী [Suvendu Adhikari]।
মঞ্চে অভয়ার মায়ের কথা চলছিল। মেয়েকে হারানোর যন্ত্রণা, তাঁর চিকিৎসক হিসেবে পরিচয়, দীর্ঘ লড়াই—এক এক করে উঠে আসছিল স্মৃতির পাতা। আর সেই বক্তব্য শুনেই চোখের জল মুছতে দেখা গেল শুভেন্দুকে। রুমাল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে তিনি কার্যত জানিয়ে দিলেন, এই লড়াই এখানেই থামছে না।
শুভেন্দুর বার্তা ছিল স্পষ্ট—“আমি যা করার করছি, করব। এর শেষ দেখে ছাড়ব।” তাঁর দাবি, অভয়ার মৃত্যুর ঘটনায় ন্যায়বিচারের লড়াই থেকে পিছিয়ে যাওয়ার প্রশ্নই নেই।
‘অভয়াকে ভুলিনি’—শুভেন্দুর বার্তা
অভয়ার স্মরণসভায় শুভেন্দু বলেন, রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে নির্যাতিত চিকিৎসকের স্মরণে নীরবতা পালন করা হয়েছে। তাঁর কথায়, এই ঘটনা এমন এক ভয়াবহ স্মৃতি তৈরি করেছে, যা সহজে মুছে যাওয়ার নয়।
নারী নির্যাতনের অভিযোগে পুলিশি ভূমিকা নিয়েও কড়া বার্তা দেন তিনি। অভিযোগ পাওয়ার পর কোনও প্রভাবশালী ব্যক্তির ফোন বা নির্দেশের অপেক্ষা না করে দ্রুত পদক্ষেপ করার কথা বলেন বিরোধী দলনেতা।
শুভেন্দুর বক্তব্য, নারী নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে প্রশাসনকে দ্রুত সক্রিয় হতে হবে। তাঁর কথায়, “এর শেষ আমাদের দেখতেই হবে।”
অভয়ার মায়ের বক্তব্যে ভেঙে পড়লেন শুভেন্দু
পানিহাটির অভয়া স্মরণ মঞ্চে বক্তব্য রাখতে গিয়ে আবেগঘন হয়ে পড়েন অভয়ার মা। মেয়ের ছোটবেলার স্মৃতি থেকে চিকিৎসক জীবনের কথা—সবই উঠে আসে তাঁর বক্তব্যে।
তিনি জানান, মেয়ের লড়াই তিনি এখনও ছাড়েননি। মেয়েকে শুধু একজন নির্যাতিতা হিসেবে নয়, একজন চিকিৎসক হিসেবে মানুষের সামনে প্রতিষ্ঠিত করাই তাঁর লক্ষ্য।
মেয়ের রোগীদের প্রতি যত্নশীলতার কথাও স্মরণ করেন তিনি। বলেন, মেয়েকে হারানোর পরও তাঁর ন্যায়বিচারের দাবি থেকে সরে দাঁড়ানোর কোনও প্রশ্ন নেই।
এই কথাগুলিই মঞ্চে বসে থাকা শুভেন্দুকে আবেগপ্রবণ করে তোলে। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর তাঁকে চোখের জল মুছতে দেখা যায়।
শ্মশানের দাহ প্রক্রিয়া নিয়েও বিস্ফোরক অভিযোগ
এ দিন শুধু আবেগ নয়, নতুন করে তদন্তের দাবিও সামনে আসে। শুভেন্দুর অভিযোগ, আরজি করের নির্যাতিতার দাহ প্রক্রিয়াতেও গুরুতর অনিয়ম হয়েছিল।
ঘোলা থানার অন্তর্গত নাটাগড় কদমতলা শ্মশানে দাহকার্যের প্রক্রিয়া নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর দাবি, নির্ধারিত সিরিয়াল বদলে দ্রুত সৎকার করা হয়েছিল এবং প্রয়োজনীয় কিছু নথি ও স্বাক্ষর নেওয়ার ক্ষেত্রেও নিয়ম মানা হয়নি।
এই অভিযোগের ভিত্তিতেই রাজ্য পুলিশের আওতাধীন এলাকায় পৃথক মামলা দায়ের করে তদন্তের নির্দেশ দেওয়ার কথা জানান শুভেন্দু।
তিনি অভিযোগ করেন, এই ঘটনায় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির ভূমিকা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তবে অভিযোগগুলি তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার আগেই কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যাবে না—এটাই এখন তদন্তের মূল বিষয়।
সিবিআই তদন্তের বাইরে থাকা অংশে রাজ্য পুলিশের তদন্ত?
আরজি কর-কাণ্ডের তদন্তের বিভিন্ন দিক ইতিমধ্যেই আদালতের নির্দেশে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার আওতায় রয়েছে। কিন্তু শ্মশানের দাহ প্রক্রিয়া সংক্রান্ত অভিযোগ রাজ্য পুলিশের এক্তিয়ারভুক্ত হতে পারে বলে দাবি করেন শুভেন্দু।
সেই কারণেই ব্যারাকপুর পুলিশ কমিশনারকে প্রকাশ্য মঞ্চ থেকে এফআইআর করে তদন্ত শুরুর নির্দেশ দেন তিনি। তদন্তে অভিযোগগুলির সত্যতা কতটা, কার ভূমিকা ছিল এবং নিয়ম ভাঙা হয়েছিল কি না—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সরকারি হাসপাতালে নীরবতা পালন
৯ অগস্ট সকালে রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে আরজি করের নির্যাতিত চিকিৎসকের স্মরণে দুই মিনিটের নীরবতা পালন করা হয়। নির্ধারিত সময় সকাল ১১টায় চিকিৎসক, নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা এই কর্মসূচিতে অংশ নেন।
প্রদীপ জ্বালিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর পর নীরবতা পালন করা হয়। আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালেও কর্মসূচি হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন প্রাক্তন তৃণমূল রাজ্যসভার সাংসদ শান্তনু সেন [Shantanu Sen]।
আরজি কর-কাণ্ডের পর আন্দোলনে সরব থাকা শান্তনু সেনও তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে মুখ খোলেন। তাঁর বক্তব্য, প্রকৃত সত্য সামনে আনতে আরও পদক্ষেপ প্রয়োজন। পাশাপাশি তথ্যপ্রমাণ নষ্টের অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্টদেরও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
রাজনৈতিক চাপের কেন্দ্রে ফের ‘অভয়া’ ইস্যু
দুই বছর পরেও আরজি কর-কাণ্ড শুধু একটি অপরাধের তদন্ত নয়—এটি এখন বাংলার রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। বিচার, তদন্তের গতি, প্রশাসনের ভূমিকা এবং প্রমাণ নষ্টের অভিযোগ—সবকিছু নিয়েই রাজনৈতিক চাপ অব্যাহত।
অভয়ার পরিবারের ন্যায়বিচারের দাবি, বিরোধীদের আক্রমণ এবং প্রশাসনের পদক্ষেপ—এই তিনটি দিক আগামী দিনে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
শুভেন্দুর আবেগঘন বক্তব্য এবং নতুন করে শ্মশানের দাহ প্রক্রিয়া নিয়ে তদন্তের দাবি সেই বিতর্ককেই আরও উসকে দিয়েছে।
দুই বছর পরেও তাই প্রশ্ন একটাই—আরজি করের সেই রাতের পুরো সত্য কি এবার আরও এক ধাপ সামনে আসবে? আর নতুন তদন্তে সত্যিই কি খুলবে সেই অন্ধকারের দরজা?
















































