সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হেনস্তার অভিযোগের প্রতিবাদে প্রেস ক্লাব থেকে ডোরিনা ক্রসিং পর্যন্ত মিছিল, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপের দাবিতে একজোট সাংবাদিক মহল
ভারত নিউজ ২৪*৭
কলকাতার (Kolkata Protest) রাজপথে এদিন অন্যরকম ছবি। হাতে ক্যামেরা নয়, প্রতিবাদের প্ল্যাকার্ড। মাইক্রোফোন নয়, গর্জে উঠল প্রতিবাদের স্লোগান। সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সহকর্মীদের উপর হামলার অভিযোগে সোমবার ধর্মতলা কার্যত সাক্ষী থাকল সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদের।
গত শুক্রবার নিট-সংক্রান্ত আন্দোলনের সময় একাধিক সংবাদকর্মীর উপর হামলা, হেনস্তা ও অশালীন আচরণের অভিযোগ ওঠার পর থেকেই ক্ষোভ বাড়ছিল সাংবাদিক মহলে। সেই ক্ষোভই সোমবার রাস্তায় নেমে এল সংগঠিত প্রতিবাদের মাধ্যমে।
কলকাতা প্রেস ক্লাব (Kolkata Press Club) চত্বর থেকে শুরু হওয়া এই প্রতিবাদ মিছিল ধর্মতলার ( Dharmatala) ডোরিনা ক্রসিং পর্যন্ত পৌঁছয়। সেখানে কিছুক্ষণ অবস্থান বিক্ষোভ ও প্রতীকী অবরোধ করেন সাংবাদিকরা। তাঁদের হাতে ছিল বিভিন্ন প্রতিবাদী প্ল্যাকার্ড। দাবি একটাই—সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে কোনও সাংবাদিক যেন আর হামলার শিকার না হন এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
প্রতিবাদ মঞ্চে উঠে আক্রান্ত সাংবাদিকরা সেই দিনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। কারও দাবি, সংবাদ সংগ্রহের সময় তাঁদের লক্ষ্য করে বোতল থেকে জল ছোড়া হয়। কেউ বলেন, থুথু ছেটানো হয়েছে। একাধিক মহিলা সাংবাদিকের অভিযোগ, তাঁদের সঙ্গে অশালীন আচরণ করা হয়েছে। বেশ কয়েকজন সাংবাদিক আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি পর্যন্ত হন।
এই প্রতিবাদে যোগ দিতে দূর পূর্ব বর্ধমানের কাটোয়া (SEO: Katwa) থেকেও উপস্থিত হন প্রবীণ সাংবাদিক সন্তোষ দত্ত। নবতিপর এই সাংবাদিকের উপস্থিতি অনেকের নজর কাড়ে। তাঁর বক্তব্য, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা শুধু একটি পেশাগত বিষয় নয়, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি।
প্রতিবাদ কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর আক্রান্ত সাংবাদিকদের একটি প্রতিনিধি দল লোকভবনে গিয়ে রাজ্যপাল আর. এন. রবি-র (SEO: RN Ravi) সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করেন। যদিও রাজ্যপাল উপস্থিত না থাকায় তাঁদের সাক্ষাৎ হয়নি। পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, রাজ্যপাল উপস্থিত থাকলে তাঁর হাতে এই ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে একটি স্মারকলিপি তুলে দেওয়া হবে।
প্রসঙ্গত, নিট পরীক্ষায় দুর্নীতির অভিযোগ এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে দেশজুড়ে প্রতিবাদ কর্মসূচির অংশ হিসেবে গত শুক্রবার কলকাতায় বাম ছাত্র সংগঠনগুলির উদ্যোগে একটি মিছিল হয়েছিল। সেই মিছিল ঘিরেই উত্তেজনা তৈরি হয়। অভিযোগ ওঠে, সেই কর্মসূচির মাঝেই কয়েকজন সংবাদকর্মীকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয় এবং সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের কাজ করতে বাধা দেওয়া হয়।
ঘটনার পর বিষয়টি রাজনৈতিক গুরুত্বও পায়। আহত সাংবাদিকদের দেখতে হাসপাতালে যান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (SEO: Suvendu Adhikari)। তিনি দোষীদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপের আশ্বাস দেন এবং প্রশাসনকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।
অন্যদিকে, মিছিলের উদ্যোক্তা বাম ছাত্র সংগঠনগুলিও একই রাতেই একটি বিবৃতি প্রকাশ করে ঘটনার জন্য দুঃখপ্রকাশ করে। সংগঠনের নেতৃত্ব হাসপাতালে গিয়ে আহত সাংবাদিকদের সঙ্গে দেখা করেন। তাঁদের দাবি, যাঁরা হামলা ও হেনস্তার ঘটনায় জড়িত, তাঁরা সংগঠনের সদস্য নন এবং এই ধরনের আচরণকে কোনওভাবেই সমর্থন করা হয় না।
ইতিমধ্যেই সাংবাদিক ও পুলিশের দায়ের করা অভিযোগের ভিত্তিতে ১৬ জনকে গ্রেফতার করেছে কলকাতা পুলিশ (SEO: Kolkata Police)। সোমবার ধৃতদের নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে ঘটনার পুনর্নির্মাণও করা হয়। তদন্তকারীরা প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, ভিডিও ফুটেজ এবং অন্যান্য প্রমাণ সংগ্রহ করে ঘটনার পূর্ণ চিত্র খতিয়ে দেখছেন।
বিধানসভাতেও এই ঘটনা নিয়ে কড়া অবস্থান নেওয়ার বার্তা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, আইন নিজের পথে চলবে এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি জানান, গুরুতর ধারায় মামলা রুজু হয়েছে এবং তদন্তে কোনও রকম শিথিলতা দেখানো হবে না।
জলপাইগুড়ি (SEO: Jalpaiguri) থেকে এদিনও সাংবাদিকদের উদ্দেশে বার্তা দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, “সাংবাদিকদের নিরাপত্তার প্রশ্নে সরকার কোনও আপস করবে না। আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে, অভিযোগের ভিত্তিতে দ্রুত গ্রেফতারও হয়েছে। আইনের বাইরে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।”
সাংবাদিকদের বক্তব্যও স্পষ্ট—এটি কোনও রাজনৈতিক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে আন্দোলন নয়। এটি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনভাবে কাজ করার অধিকার এবং মাঠে নেমে সংবাদ সংগ্রহের নিরাপত্তার প্রশ্ন। গণতন্ত্রে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা যাতে বাধাহীন থাকে, সেই দাবিতেই এই প্রতিবাদ বলে জানান অংশগ্রহণকারীরা।
ধর্মতলার এই প্রতিবাদ আপাতত শেষ হলেও বিতর্ক কিন্তু থামেনি। তদন্ত এগোচ্ছে, রাজনৈতিক চাপানউতোরও চলছে। এখন নজর একটাই—দোষীদের বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, আর ভবিষ্যতে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন কী নতুন পদক্ষেপ নেয়। ধর্মতলার ঘটনার অভিঘাত কি শুধু গ্রেফতারেই থামবে, নাকি আরও বড় প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের পথে এগোবে রাজ্য? এখন সেই দিকেই তাকিয়ে গোটা সাংবাদিক মহল।















































