ভারত নিউজ ২৪*৭
পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর (SIR) মামলার শুনানিতে ফের উঠল বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে বড় আইনি প্রশ্ন। ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় বাদ যাওয়া ভোটারের সংখ্যা যদি কোনও কেন্দ্রের জয়ী প্রার্থীর জয়ের ব্যবধানের থেকেও বেশি হয়, তাহলে সেই নির্বাচনের ফল নিয়ে আদালত কী পদক্ষেপ করতে পারে—শুনানিতে মূলত সেই প্রশ্নই সামনে এল। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের প্রশ্ন, আদালত কি কোনও বিধানসভা কেন্দ্রে নতুন করে নির্বাচন করার নির্দেশ দিতে পারে? (Supreme Court Bengal SIR)
তৃণমূলের তরফে সওয়াল করতে গিয়ে দলের আইনজীবী তথা লোকসভার সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় আদালতে একাধিক পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য, অন্তত ৩১টি বিধানসভা কেন্দ্রে জয়ী বিজেপি প্রার্থীদের জয়ের ব্যবধানের তুলনায় এসআইআর প্রক্রিয়ায় বাদ দেওয়া ভোটারের সংখ্যা বেশি। (West Bengal SIR voter list)
শুনানিতে উদাহরণ হিসেবে সাতগাছিয়া বিধানসভা কেন্দ্রের কথা উল্লেখ করা হয়। তৃণমূলের বক্তব্য অনুযায়ী, সেখানে জয়ের ব্যবধান ছিল মাত্র ৪০১ ভোট। অথচ এসআইআর প্রক্রিয়ায় ৮,৭৮৫ জন ভোটারের নাম বাদ পড়েছিল বলে আদালতে জানানো হয়। আরও একটি কেন্দ্রে মাত্র ৩১৬ ভোটের ব্যবধানে প্রার্থী পরাজিত হয়েছেন, অথচ সেখানে বাদ যাওয়া ভোটারের সংখ্যা ছিল তার চেয়ে অনেক বেশি।
তৃণমূলের যুক্তি, এই ধরনের পরিস্থিতিতে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া বৈধ ভোটারের সংখ্যা এবং নির্বাচনী ফলাফলের ব্যবধানের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক থাকতে পারে। সেই কারণে নির্বাচনী ফল চ্যালেঞ্জ (election result challenge) করার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে বলে আদালতে দাবি করা হয়।
তবে এই যুক্তির পরেই মামলার গুরুত্বপূর্ণ আইনি দিকটি সামনে আনেন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত। তিনি জানতে চান, আবেদনকারীরা বিষয়টি নিয়ে আদালতে যেতে পারেন ঠিকই, কিন্তু আদালত কি এভাবে নতুন করে কোনও বিধানসভা কেন্দ্রে নির্বাচন করার নির্দেশ দিতে পারে? পাশাপাশি তিনি জানতে চান, যে ৩১টি কেন্দ্রে বাদ যাওয়া ভোটারের সংখ্যা জয়ের ব্যবধানের চেয়ে বেশি বলে দাবি করা হচ্ছে, সেই কেন্দ্রগুলির পরাজিত প্রার্থীরা তাঁদের প্রতিদ্বন্দ্বী জয়ী প্রার্থীদের নির্বাচনকে আনুষ্ঠানিকভাবে চ্যালেঞ্জ করেছেন কি না।
কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের তরফে জানানো হয়, কিছু কেন্দ্রে নির্বাচন মামলা হয়েছে। তবে সব কেন্দ্রেই এমন মামলা করা হয়নি। ফলে শুধুমাত্র এসআইআর-এর পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে নির্বাচনের ফলাফল পুনর্বিবেচনার সুযোগ রয়েছে কি না, সেই প্রশ্নও আইনি ভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
শুনানিতে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলেন বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী। তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল—যাঁদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, তাঁদের মধ্যে কতজন নিজেদের নাম বাদ যাওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে। (Voter deletion appeal)
কারণ, কোনও ভোটারের নাম বাদ পড়ার পর তিনি যদি সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিলই না করেন, তাহলে তাঁর হয়ে পরবর্তী সময়ে নির্বাচনের ফলাফলকে চ্যালেঞ্জ করার যুক্তি কতটা গ্রহণযোগ্য হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিচারপতি বাগচীর পর্যবেক্ষণের উদাহরণে বলা হয়, কোনও কেন্দ্রে ১০০ জন ভোটারের নাম বাদ পড়ল, জয়ী প্রার্থীর ব্যবধান ৫০ ভোট এবং বাদ পড়া ১০০ জনের মধ্যে ৬০ বা ৭০ জন যদি নিজেদের নাম বাদ যাওয়ার বিরুদ্ধে আপিল করেন, তাহলে বিষয়টি অবশ্যই অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এই মামলার পিছনে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের Special Intensive Revision বা SIR প্রক্রিয়া (Special Intensive Revision)। তৃণমূলের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিপুল সংখ্যক বৈধ ভোটারের নাম রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে এই অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়েছে—এমন দাবি করা যাচ্ছে না; বিষয়টি এখনও বিচারাধীন।
ভোটের আগে এসআইআর নিয়ে মামলা হলেও নির্বাচনের দিন ঘোষণা হয়ে যাওয়ার পর আদালত সেই পর্যায়ে নির্বাচন স্থগিত করেনি। বরং নির্বাচনের পরে পরিস্থিতি পর্যালোচনার পথ খোলা রাখা হয়েছিল বলে মামলার বক্তব্যে উঠে এসেছে। সেই পরবর্তী পর্যায়ের আইনি লড়াইতেই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে জয়ী প্রার্থীর জয়ের ব্যবধান এবং বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যার তুলনা।
তৃণমূলের তরফে আরও দাবি করা হয়েছে, বিধানসভা-ভিত্তিক আপিলের পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনও নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে প্রকাশ করা হয়নি। ফলে কোন কেন্দ্রে কতজন বাদ পড়া ভোটার তাঁদের নাম ফেরানোর জন্য আইনি পদক্ষেপ করেছেন, সেই তথ্যও এখনও সম্পূর্ণভাবে স্পষ্ট নয়।
অর্থাৎ, এসআইআর বিতর্ক এখন শুধুমাত্র ভোটার তালিকায় নাম থাকা বা না থাকার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। West Bengal Assembly election-এর ফলাফল এবং ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রভাবের মধ্যে কোনও আইনি সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা যায় কি না, সেটিই হয়ে উঠছে মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আর সেই কারণেই ৩১টি বিধানসভা কেন্দ্রের পরিসংখ্যান ঘিরে সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ নতুন করে নজর কেড়েছে।
















































