ভারত নিউজ ২৪*৭
সুন্দরবনের দুর্গম দ্বীপে চিকিৎসা পরিষেবার চেহারা বদলাতে চলেছে। নদী-খাঁড়ি পেরিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাসপাতালে পৌঁছনোর দিন কিছুটা হলেও কমাতে এবার জলপথেই পৌঁছবে চিকিৎসা পরিষেবা। আল্ট্রাসোনোগ্রাফি, পোর্টেবল এক্স-রে, রক্ত পরীক্ষা থেকে জরুরি চিকিৎসা—সবকিছু নিয়ে চালু হতে চলেছে ফ্লোটিং মেডিক্যাল ইউনিট (Sundarban Floating Medical Unit)। সঙ্গে থাকবে দ্রুতগতির স্পিডবোট অ্যাম্বুল্যান্স।
রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে দু’টি ফ্লোটিং মেডিক্যাল ইউনিট এবং ছ’টি স্পিডবোট অ্যাম্বুল্যান্স চালু করা হবে। পরে আরও ছ’টি ফ্লোটিং মেডিক্যাল ইউনিট যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। সোমবার নতুন রাজ্য সরকারের স্বাস্থ্য দফতরের প্রথম ১০০ দিনের কাজের খতিয়ান তুলে ধরতে গিয়ে এই প্রকল্পের কথা জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. শারদ্বত মুখোপাধ্যায়।
নদী-খাঁড়িই যেখানে যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম
সাতজেলিয়া, কুমিরমারি, ছোট মোল্লাখালি, লাহিড়ীপুর থেকে পাথরপ্রতিমার জিরাফখালি, কুলতলির গুরগুড়িয়া—সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ এলাকার বহু গ্রাম এখনও নদী ও খাঁড়ির উপর নির্ভরশীল। বাসন্তী ও সাগর ব্লকের একাধিক দ্বীপেও একই সমস্যা। স্থলপথের পরিকাঠামো সীমিত হওয়ায় কোনও বাসিন্দা গুরুতর অসুস্থ হলে নিকটবর্তী স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা হাসপাতালে পৌঁছতেই অনেকটা সময় লেগে যায়।
বিশেষ করে প্রসূতি, দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তি কিংবা গুরুতর অসুস্থ রোগীর ক্ষেত্রে এই বিলম্ব বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। সেই সমস্যার কথা মাথায় রেখেই জলপথকে স্বাস্থ্য পরিষেবার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার পরিকল্পনা নিয়েছে স্বাস্থ্য দফতর।
জলের উপরেই ইউএসজি, এক্স-রে, রক্ত পরীক্ষা
নতুন ফ্লোটিং মেডিক্যাল ইউনিট (Floating Medical Unit)-গুলিতে একাধিক প্রাথমিক ডায়াগনস্টিক পরিষেবা রাখার পরিকল্পনা হয়েছে। থাকবে আল্ট্রাসোনোগ্রাফি বা ইউএসজি, পোর্টেবল এক্স-রে মেশিন এবং বিভিন্ন ধরনের রক্ত পরীক্ষার পরিকাঠামো।
এর পাশাপাশি থাকবে জরুরি ওষুধপত্র, নার্সিং পরিষেবা এবং হাড় ভাঙার ক্ষেত্রে প্লাস্টার করার ব্যবস্থা। ফলে সাধারণ অসুস্থতা কিংবা প্রাথমিক পরীক্ষার জন্য প্রত্যন্ত দ্বীপের বাসিন্দাদের প্রতিবার শহর বা বড় হাসপাতালে ছুটতে হবে না।
স্বাস্থ্য দফতরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইউনিটগুলিতে অভিজ্ঞ চিকিৎসক ও নার্স থাকবেন। স্থানীয় স্তর থেকে চিকিৎসক, জিএনএম এবং নার্সিং স্টাফ নিয়োগের পরিকল্পনাও রয়েছে। চিকিৎসকদের বদলি না করার নীতির কথাও জানানো হয়েছে, যাতে স্থানীয় চিকিৎসকরাই দীর্ঘমেয়াদে ওই এলাকার বাসিন্দাদের পরিষেবা দিতে পারেন।
৪০ কিলোমিটার গতির স্পিডবোট অ্যাম্বুল্যান্স
শুধু ভাসমান স্বাস্থ্যকেন্দ্র তৈরি করেই থেমে থাকছে না স্বাস্থ্য দফতর। দুর্গম দ্বীপে জরুরি রোগী উদ্ধারের জন্য চালু হবে ছ’টি স্পিডবোট অ্যাম্বুল্যান্স (Speedboat Ambulance)। স্বাস্থ্য দফতরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘণ্টায় প্রায় ৪০ কিলোমিটার গতিতে চলতে পারবে এই জলযানগুলি।
কোনও প্রত্যন্ত এলাকায় জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হলে সংকেত পাওয়ার পর দ্রুত সেখানে পৌঁছবে স্পিডবোট। রোগীকে তুলে প্রথমে নিকটবর্তী ফ্লোটিং মেডিক্যাল ইউনিটে নিয়ে আসা হবে। সেখানে প্রাথমিক পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার পর রোগীর পরিস্থিতি অনুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
জটিল রোগীর ক্ষেত্রে ফ্লোটিং ইউনিটে চিকিৎসা সীমাবদ্ধ না রেখে তাঁকে দ্রুত নিকটবর্তী স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা উন্নত চিকিৎসা পরিকাঠামোয় পাঠানোর ব্যবস্থা থাকবে। প্রয়োজনে স্পিডবোট অ্যাম্বুল্যান্সের পাশাপাশি ১০২ অ্যাম্বুল্যান্স পরিষেবাও ব্যবহার করা হবে।
মোবাইল মেডিক্যাল ইউনিটেও অত্যাধুনিক সরঞ্জাম
এই জলপথের স্বাস্থ্য পরিষেবা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে মোবাইল মেডিক্যাল ইউনিট (Mobile Medical Unit)। সেখানে সেমি-অটো অ্যানালাইজার, সেল কাউন্টার, ইসিজি-সহ বিভিন্ন পোর্টেবল চিকিৎসা সরঞ্জাম থাকবে।
অর্থাৎ, শুধু রোগীকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়াই এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য নয়। রোগী উদ্ধারের পর দ্রুত পরীক্ষা, প্রাথমিক চিকিৎসা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী উন্নত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে স্থানান্তর—পুরো প্রক্রিয়াকে একটি সমন্বিত নেটওয়ার্কের মধ্যে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
৪৫ দিনের মধ্যেই প্রথম পরিষেবা?
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, কলকাতার ফেয়ারলি প্লেস ঘাটে নির্মীয়মাণ দু’টি ফ্লোটিং মেডিক্যাল ইউনিট ইতিমধ্যেই পরিদর্শন করা হয়েছে। স্বাস্থ্য দফতরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী দেড় মাসের মধ্যে অর্থাৎ প্রায় ৪৫ দিনের মধ্যেই প্রথম দু’টি ইউনিট পরিষেবা দেওয়া শুরু করতে পারে।
পরবর্তী পর্যায়ে আরও ছ’টি ফ্লোটিং মেডিক্যাল ইউনিট যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে ধাপে ধাপে সুন্দরবনের আরও বিস্তীর্ণ এলাকায় জলপথে চিকিৎসা পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
দুর্গম সুন্দরবনে নতুন স্বাস্থ্য নেটওয়ার্ক
সুন্দরবনের ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতাই স্বাস্থ্য পরিষেবার ক্ষেত্রে অন্যতম বড় বাধা। নদী, খাঁড়ি ও দ্বীপে ছড়িয়ে থাকা জনবসতির কারণে স্থলপথের প্রচলিত পরিকাঠামো দিয়ে দ্রুত চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়া সবসময় সম্ভব হয় না। সেই জায়গায় জলপথকে ব্যবহার করে চিকিৎসা পরিষেবার নতুন মডেল তৈরি করতে চাইছে রাজ্য স্বাস্থ্য দফতর।
ফ্লোটিং মেডিক্যাল ইউনিটে পরীক্ষা ও প্রাথমিক চিকিৎসা, স্পিডবোটে দ্রুত রোগী উদ্ধার এবং প্রয়োজন হলে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে স্থানান্তর—এই তিন স্তরকে একসঙ্গে কাজ করানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। বাস্তবে এই ব্যবস্থা কতটা দ্রুত এবং কার্যকরভাবে সুন্দরবনের প্রত্যন্ত মানুষের কাছে পৌঁছতে পারে, এখন নজর সেদিকেই।
দুর্গম দ্বীপে বসবাসকারী মানুষের কাছে চিকিৎসার দূরত্ব কমানোই এই Sundarban healthcare project-এর মূল লক্ষ্য। সফলভাবে পরিষেবা চালু হলে নদী-খাঁড়ি পেরিয়ে চিকিৎসা পাওয়ার দীর্ঘদিনের সমস্যায় তা বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
















































