ছাত্র আন্দোলনে বলপ্রয়োগ, সাংবাদিক ও আইনজীবীদের উপর হামলার অভিযোগও গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে শীর্ষ আদালত। নিরপেক্ষ তদন্ত ও হাই-পাওয়ার কমিটির ইঙ্গিত ঘিরে জোর চর্চা।
ভারত নিউজ ২৪*৭
দেশজুড়ে ছাত্র আন্দোলন ঘিরে উত্তেজনার আবহের মধ্যেই বড় বার্তা দিল সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court)। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের আড়ালে সমাজবিরোধী শক্তি ঢুকে পড়ার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না বলে মন্তব্য করল দেশের সর্বোচ্চ আদালত। একই সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ (West Bengal)-সহ সাতটি রাজ্য এবং কেন্দ্রের কাছে বিস্তারিত রিপোর্ট তলব করে শীর্ষ আদালত জানিয়ে দিল, ঘটনার প্রকৃত চিত্র সামনে আনা এখন সবচেয়ে জরুরি।
মঙ্গলবার মামলার শুনানিতে আদালতের পর্যবেক্ষণ ঘিরে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। আদালতের বক্তব্য, কোনও শান্তিপূর্ণ ছাত্র আন্দোলন যদি হঠাৎ হিংসাত্মক মোড় নেয়, তাহলে সেখানে বাইরের দুষ্কৃতীদের ভূমিকা ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত (Supreme Court) বলেন, প্রাথমিকভাবে এমন ইঙ্গিত মিলছে যে অভিযোগের কিছু দিক গুরুত্ব দিয়ে দেখার মতো। বিশেষ করে মহিলা, সাংবাদিক এবং আইনজীবীদের উপর হামলার অভিযোগকে আদালত হালকাভাবে নিচ্ছে না। প্রয়োজনে স্বাধীন তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।
কেন্দ্র ও রাজ্যগুলিকে কী নির্দেশ দিল আদালত?
শীর্ষ আদালত পশ্চিমবঙ্গ (West Bengal), দিল্লি (Delhi), মহারাষ্ট্র (Maharashtra), কেরল (Kerala), বিহার (Bihar), অসম (Assam), উত্তর প্রদেশ (Uttar Pradesh) এবং কেন্দ্রের কাছে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট চেয়েছে। আদালত জানিয়েছে, সমস্ত রিপোর্ট খতিয়ে দেখার পরই সিদ্ধান্ত হবে স্বাধীন তদন্ত হবে, নাকি বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠন করা হবে।
এছাড়াও আদালত স্পষ্ট করেছে, শুধুমাত্র আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে কোনও ছাত্রছাত্রীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না। তবে যদি কারও বিরুদ্ধে পৃথক অপরাধমূলক অভিযোগ বা ফৌজদারি মামলা থাকে, তাহলে আইন অনুযায়ী পুলিশ ব্যবস্থা নিতে পারবে।
তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ সংরক্ষণের নির্দেশ
ভবিষ্যতের তদন্ত যাতে নিরপেক্ষভাবে এগোতে পারে, তার জন্য একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছে আদালত। সিসিটিভি ফুটেজ, ড্রোন ক্যামেরার ভিডিও, বডি-ক্যামের রেকর্ডিং, অন্যান্য ভিডিও ফুটেজ এবং ওয়্যারলেস যোগাযোগের তথ্য সংরক্ষণ করতে হবে বলে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পুলিশি ভূমিকা নিয়ে ওঠা অভিযোগ খতিয়ে দেখতে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠনের সম্ভাবনার কথাও আদালতে উঠে এসেছে। পাশাপাশি, আটক অপ্রাপ্তবয়স্কদের দ্রুত মুক্তির বিষয়েও আদালত গুরুত্ব দিয়েছে।
কেন্দ্রের বক্তব্য কী?
কেন্দ্র এবং দিল্লি সরকার (Delhi Government)-এর পক্ষে আদালতে সওয়াল করেন সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা (Tushar Mehta)। তিনি বলেন, কোথাও যদি অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ হয়ে থাকে, তাহলে তা অবশ্যই তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
তবে তিনি আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করে জানান, সংঘর্ষে বহু পুলিশকর্মীও আহত হয়েছেন। তাই তদন্ত এমনভাবে হওয়া দরকার, যাতে সত্য সামনে আসে এবং একই সঙ্গে আইনরক্ষাকারী বাহিনীর মনোবলেও অযথা আঘাত না লাগে।
তুষার মেহতা আরও দাবি করেন, আন্দোলনে অংশ নেওয়া অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীকে তিনি হিংসার সঙ্গে জড়িত বলে মনে করেন না। সরকারের কাছে এমন তথ্য রয়েছে যে কিছু সমাজবিরোধী এবং গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি আন্দোলনের ভিড়ে মিশে পরিস্থিতিকে অশান্ত করার চেষ্টা করেছিল। আদালত সেই দাবিও নথিভুক্ত করেছে।
কোন মামলার প্রেক্ষিতে এই শুনানি?
এই মামলার সূত্রপাত হয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’-র ডাকা বিক্ষোভ কর্মসূচিকে ঘিরে। গত ২০ জুলাই যন্তর-মন্তর (নয়াদিল্লি) থেকে ‘সংসদ চলো’ অভিযানের সময় পুলিশের লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। সেই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিতে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন আরজেডি (RJD) সাংসদ মনোজ ঝা (Manoj Jha)।
উল্লেখযোগ্যভাবে, এর আগের শুনানিতেও সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছিল, সংবিধান শান্তিপূর্ণ ও আইনসম্মত প্রতিবাদের অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়। তাই শুধুমাত্র আন্দোলন হচ্ছে বলেই বলপ্রয়োগ করা যায় না—প্রতিটি পদক্ষেপের যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকতে হবে।
রাজনৈতিক তাৎপর্য বাড়ছে
এই পর্যবেক্ষণ এমন এক সময়ে এল, যখন ছাত্র আন্দোলন, আইন-শৃঙ্খলা এবং পুলিশি ভূমিকা নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক চলছে। আদালতের নির্দেশের পর এখন নজর থাকবে রাজ্য ও কেন্দ্র কী রিপোর্ট জমা দেয় এবং সেই রিপোর্টের ভিত্তিতে শীর্ষ আদালত স্বাধীন তদন্ত বা SIT গঠনের পথে হাঁটে কি না।
কারণ, এই রিপোর্টই ঠিক করে দিতে পারে—ছাত্র আন্দোলনের আড়ালে সত্যিই কারা ছিল, আর সেই সত্য সামনে এলে দেশের রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের দরজা খুলবে কি না।















































