দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রাক্তন তৃণমূল সাংসদদের ব্রেকফাস্ট, কলকাতায় মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে ঋতব্রত শিবিরের বৈঠক—দুই ঘটনাকে জুড়ে তীব্র আক্রমণ তৃণমূল নেতা কুনাল ঘোষের
ভারত নিউজ ২৪*৭
বাংলার রাজনীতিতে বৃহস্পতিবার যেন একসঙ্গে দু’টি ছবি ধরা পড়ল। একটি দিল্লির ক্ষমতার করিডরে, অন্যটি রাজ্যের প্রশাসনিক সদর দফতর নবান্নে। আর সেই দুই ছবিকেই হাতিয়ার করে বিস্ফোরক আক্রমণ শানালেন তৃণমূলের অন্যতম মুখ কুনাল ঘোষ (Kunal Ghosh)।
তাঁর একটাই মন্তব্য এখন রাজনৈতিক মহলে ঝড় তুলেছে—“গদ্দার টিম ১ গেছে মোদীর কাছে, আর গদ্দার টিম ২ গেছে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে।”
ঘটনার সূত্রপাত বৃহস্পতিবার সকালে। দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi)-র সঙ্গে ব্রেকফাস্ট বৈঠকে যোগ দেন তৃণমূল ছেড়ে এনসিপিআই (NCPI)-তে যোগ দেওয়া একাধিক সাংসদ। প্রায় একই সময়ে নবান্ন (Nabanna, Kolkata)-এ মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বসেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন একদল বিধায়ক।
দুই বৈঠকের রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে যখন জোর চর্চা শুরু হয়েছে, তখনই সামনে আসে কুনাল ঘোষের তীব্র প্রতিক্রিয়া।
তাঁর দাবি, বাংলার মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্যই এই ধরনের রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করা হচ্ছে। কুনালের কথায়, যারা নিজেদের বিরোধী শক্তি বলে দাবি করছে, তাদের একাংশ কেন্দ্রের শাসক দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াচ্ছে, আবার অন্য অংশ রাজ্যের ক্ষমতার কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে।
সেখানেই থেমে থাকেননি তিনি। সরাসরি অভিযোগ করে বলেন, “বিজেপি এমন এক বিরোধী শক্তি তৈরি করতে চাইছে, যারা নামমাত্র বিরোধিতা করবে, কিন্তু কখনও শাসকের বিরুদ্ধে প্রকৃত লড়াই গড়ে তুলবে না।”
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এই মন্তব্যের মাধ্যমে কুনাল শুধু এনসিপিআইকেই নিশানা করেননি, বরং রাজ্যের বিরোধী রাজনীতির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
এদিন নিজের বক্তব্যের সমর্থনে একটি রাজনৈতিক বার্তাও দেওয়ার চেষ্টা করেন তৃণমূল নেতা। তিনি বলেন, যখন দিল্লি ও কলকাতায় বৈঠকের রাজনীতি চলছে, তখন প্রকৃত বিরোধী রাজনীতি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যে রয়েছে। সেই প্রসঙ্গেই তিনি উল্লেখ করেন বাঁকুড়া (Bankura)-য় এক আশা কর্মীর বাড়িতে যাওয়ার ঘটনা।
এরপর আরও কড়া ভাষায় এনসিপিআই-কে আক্রমণ করেন কুনাল। তাঁর দাবি, দলটি বর্তমানে রাজনৈতিকভাবে দিশেহারা অবস্থায় রয়েছে এবং নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতেই একের পর এক পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হচ্ছে। যদিও এই অভিযোগের পক্ষে তিনি কোনও নির্দিষ্ট তথ্য সামনে আনেননি, তবুও তাঁর মন্তব্যকে ঘিরে রাজনৈতিক চাপানউতোর দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে।
সবচেয়ে বেশি চর্চায় এসেছে তাঁর আরেকটি মন্তব্য। বৈঠকে অংশ নেওয়া নেতাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “মানুষ সব দেখছে। ভোটের সময় বাংলার মানুষই ঠিক করে দেবে কারা মানুষের পাশে ছিল আর কারা শুধু ক্ষমতার রাজনীতি করেছে।”
তবে কুনালের আক্রমণের নিশানা শুধু রাজ্যের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি পরোক্ষে নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) এবং অমিত শাহ (Amit Shah)-কেও কটাক্ষ করেন। তাঁর বক্তব্য, রাজনৈতিক শুদ্ধতার দাবি করা হলেও বাস্তবে বিভিন্ন বিতর্কে জড়ানো নেতাদের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা হচ্ছে। সেই কারণেই রাজনৈতিক নৈতিকতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
এই মন্তব্যের পর থেকেই রাজনৈতিক মহলে জল্পনা তুঙ্গে। দিল্লির ব্রেকফাস্ট বৈঠক এবং নবান্নের সাক্ষাৎ কি শুধুই সৌজন্য বৈঠক, নাকি এর পিছনে রয়েছে বড় কোনও রাজনৈতিক সমীকরণ? বিরোধী রাজনীতির ভবিষ্যৎ কি নতুন মোড় নিতে চলেছে? নাকি এটি শুধুই কৌশলগত অবস্থান বদলের ইঙ্গিত?
এই প্রশ্নগুলির উত্তর এখনই স্পষ্ট নয়। তবে একটা বিষয় পরিষ্কার—একদিনের দুই বৈঠক বাংলার রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে।
আর সেই আগুনে কুনাল ঘোষের ‘গদ্দার টিম ১’ বনাম ‘গদ্দার টিম ২’ মন্তব্য যে আগামী কয়েকদিন রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে, তা বলাই যায়।
দিল্লির ব্রেকফাস্ট আর নবান্নের বৈঠক—এ কি কেবল কাকতালীয়, নাকি বাংলার রাজনীতিতে বড় সমীকরণ বদলের পূর্বাভাস? উত্তর খুঁজছে রাজনৈতিক মহল, নজর এখন পরবর্তী চালের দিকে।
















































