হাওড়ার কলেজ পড়ুয়ার বিরুদ্ধে মন্ত্রীর গতিবিধি ও পরিবারের তথ্য জোগাড় করে হামিমের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগ, তদন্তে উঠে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য
ভারত নিউজ ২৪*৭
রাজ্যের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়ে দিল হামিম মণ্ডলকে ঘিরে তদন্ত। প্রথমে মনে করা হয়েছিল, পাকিস্তান-যোগের অভিযোগে ধৃত হামিমের মূল টার্গেট ছিলেন শুধু মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। কিন্তু তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে আরও বিস্ফোরক তথ্য। গোয়েন্দাদের দাবি, রাজ্যের নগরোন্নয়ন দফতরের প্রতিমন্ত্রী উমেশ রাই (Umesh Rai) এবং তাঁর পরিবারও ছিল জঙ্গি চক্রের নজরে।
এই মামলায় সোমবার বড় সাফল্য পেয়েছে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের এসটিএফ (West Bengal STF)। হাওড়ার বেলিলিয়াস রোড (Belilious Road, Howrah) থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে আদিত্য সিংহ ওরফে রাজ নামে এক কলেজ পড়ুয়াকে। তদন্তকারীদের দাবি, ধৃত যুবকের সঙ্গে হামিম মণ্ডলের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল এবং মন্ত্রীর ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকতে পারে।
পুলিশ সূত্রের খবর, উমেশ রাইকে কিছুদিন আগে পাকিস্তান থেকে একটি হুমকির ফোন আসে। অভিযোগ, ফোনের অপর প্রান্তে থাকা ব্যক্তি নিজেকে আবিদ জাঠ নামে পরিচয় দিয়ে মন্ত্রীকে খুন এবং তাঁর ছেলেকে অপহরণের হুমকি দেয়। শুধু তাই নয়, মন্ত্রীর পরিবারের বিস্তারিত তথ্য তাঁদের কাছে রয়েছে বলেও দাবি করা হয়।
প্রথমে বিষয়টিকে খুব একটা গুরুত্ব না দিলেও পরে পুলিশকে অভিযোগ জানান প্রতিমন্ত্রী। সেই অভিযোগের তদন্তভার যায় এসটিএফের হাতে। তদন্তে একের পর এক ডিজিটাল সূত্র বিশ্লেষণ করতে গিয়েই তদন্তকারীদের নজরে আসে বর্ধমানের বাসিন্দা হামিম মণ্ডল। এরপর তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। হামিমকে জেরা করতে গিয়েই উঠে আসে আরও কয়েকটি নাম, যার মধ্যে অন্যতম আদিত্য।
তদন্তকারীদের প্রাথমিক অনুমান, আদিত্যই নাকি মন্ত্রীর ছবি, যাতায়াতের রুট, দৈনন্দিন গতিবিধি এবং পরিবারের বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে হামিমের কাছে পাঠাতেন। সেই তথ্য পরে পাকিস্তানি হ্যান্ডলারদের কাছেও পৌঁছেছে কি না, তা এখন খতিয়ে দেখছেন গোয়েন্দারা।
এসটিএফ সূত্রে জানা গিয়েছে, হামিম ও আদিত্যের পরিচয় হয় একটি অনলাইন গেমিং অ্যাপের মাধ্যমে। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। তদন্তকারীদের দাবি, সেই সম্পর্কের সুযোগ নিয়েই আদিত্যর ‘মগজধোলাই’ করা হয় এবং পরে তাকে নির্দিষ্ট দায়িত্ব দেওয়া হয়। অভিযোগ, প্রতিমন্ত্রী উমেশ রাইয়ের উপর নজরদারি চালিয়ে সমস্ত তথ্য হামিম এবং তার সহযোগীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করছিল সে।
এই মামলায় ধৃত হামিমের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে অর্পিতা নামে এক তরুণীর নামও উঠে এসেছে। তদন্তকারীদের দাবি, হামিম ও অর্পিতাকে জেরা করেই আদিত্যর পরিচয় এবং অবস্থান সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র মেলে। এরপরই হাওড়ার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
সোমবার সকালে আদিত্যর বাড়িতে পৌঁছে তাঁর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও কথা বলেন তদন্তকারীরা। বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে একাধিক ডিজিটাল ডিভাইস বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। যদিও আদিত্যর পরিবারের দাবি, তিনি একজন সাধারণ ছাত্র এবং এই ধরনের কোনও কার্যকলাপের সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়ে তাঁদের কোনও ধারণাই ছিল না।
আদিত্যর মা সংবাদমাধ্যমকে বলেন, তাঁর ছেলে পড়াশোনা নিয়েই ব্যস্ত থাকত। কার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল বা কেন তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে, সে সম্পর্কে পরিবারের কাছে কোনও তথ্য নেই। তবে তদন্তকারীরা এখন ডিজিটাল যোগাযোগ, চ্যাট হিস্ট্রি এবং অন্যান্য ইলেকট্রনিক তথ্য বিশ্লেষণ করে পুরো নেটওয়ার্কের হদিস পাওয়ার চেষ্টা করছেন।
পুলিশের অনুমান, এই মামলার শিকড় শুধু রাজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সীমান্তের বাইরে বসে থাকা হ্যান্ডলারদের সঙ্গে যোগাযোগের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আদিত্যকে আদালতে পেশ করে পুলিশি হেফাজতের আবেদন জানানো হবে, যাতে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আনা যায়।
এই ঘটনায় রাজনৈতিক মহলেও তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। একজন মন্ত্রীর নিরাপত্তা, তাঁর পরিবারের তথ্য সংগ্রহ এবং সম্ভাব্য জঙ্গি যোগ—সব মিলিয়ে তদন্ত এখন অত্যন্ত স্পর্শকাতর পর্যায়ে পৌঁছেছে। এসটিএফের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, হামিম মণ্ডলের নেটওয়ার্ক ঠিক কতটা বিস্তৃত এবং এর পেছনে আর কারা রয়েছে?
তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই নতুন নতুন তথ্য সামনে আসছে। এবার এসটিএফের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, আর এই চক্রের শেষ প্রান্তে কারা রয়েছে—সেই দিকেই এখন নজর গোটা রাজ্যের।

















































