অন্নপূর্ণা-বিক্ষোভে উত্তাল বাংলা, রেল-সড়ক ও সরকারি অফিস অবরোধে মহিলারা
ভারত নিউজ ২৪*৭
শুক্রবার পশ্চিম মেদিনীপুরে গিয়েছিলেন পুর-নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা। জেলাশাসকের অফিসে ঢোকার আগে একদফা প্রশ্নের মুখে পড়েন তিনি। মিটিং চলাকালীন জেলাশাসকের দফতরের নীচতলায় ঢুকে পড়লেন মহিলারা।
অন্নপূর্ণা-বিক্ষোভ অব্যাহত। শুভেন্দু অধিকারীর সরকারঘোষিত মহিলাদের আর্থিক সহায়তা প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগে শুক্রবারও দক্ষিণবঙ্গ থেকে উত্তরবঙ্গে দেখা গেল ক্ষোভের ছবি। পশ্চিম মেদিনীপুরে প্রশাসনিক ভবনে বৈঠকের মাঝে মহিলাদের বিক্ষোভে উঠে আসতে বাধ্য হলেন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। উত্তর ২৪ পরগনায় রেলপথ অবরোধ করলেন অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা না-পাওয়া মহিলারা। বিক্ষোভ হল কলকাতাতেও।
শুক্রবার পশ্চিম মেদিনীপুরে গিয়েছিলেন পুর-নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা। জেলাশাসকের অফিসে ঢোকার আগে একদফা প্রশ্নের মুখে পড়েন তিনি। মিটিং চলাকালীন জেলাশাসকের দফতরের নীচতলায় ঢুকে পড়লেন মহিলারা। বাধ্য হয়ে দুপুর আড়াইটেয় পূর্বনির্ধারিত বৈঠক বন্ধ করে নীচে নেমে আসতে হল মন্ত্রীকে। বিক্ষোভ সামাল দিতে যান জেলাশাসক বিজিন কৃষ্ণা এবং স্থানীয় বিধায়ক শঙ্কর গুছাইতও। অগ্নিমিত্রা মহিলাদের উদ্দেশে বলেন, ”একটু সময় দিন। সবে তো ১০০ দিন হয়েছে।” সঙ্গে সঙ্গে কোলাহল বাড়ে। মন্ত্রী আবার বলেন, ”আস্তে কথা বলুন। তা হলেই শুনতে পাব।” তিনি জানান, সমাধান চান বলেই তিনি বৈঠক ছেড়ে উঠে এসেছেন। অন্নপূর্ণার টাকার জন্য এসডিও অফিসে গিয়ে নাম, ফোন নম্বর, এনরোলমেন্ট নম্বর জমা দিতে বলেন।
অগ্নিমিত্রা আরও বলেন, ”ভেরিফিকেশনে কেন (নাম) কাটা গিয়েছে, সেটা দেখছি। জুন, জুলাইয়ে কি টাকা পেয়েছেন?” অন্নপূর্ণার টাকার দাবি করা মহিলারা সমস্বরে বলেন, ”এক মাসও পাইনি।” তখন মন্ত্রী জেলাশাসককে বলেন, ”একজন নোডাল অফিসার দিন।” মহিলারা তাঁদের অভিযোগ জানাতে থাকেন। তাঁদের অভিযোগ, টাকার জন্য এই অফিস-ওই অফিস ছুটতে বাধ্য করা হচ্ছে তাঁদের। এসডিও অফিস গেলে বলা হচ্ছে পুরসভায় যেতে। পুরসভায় গেলে বলা হচ্ছে এসডিও অফিসে যেতে। তখন মন্ত্রী বলেন, ”আপনারা এসডিও এবং বিডিও অফিস যান, সেখানেই জমা দিন কাগজ। আমার মিটিং চলছে। আপনারা এসেছেন বলে আমি মিটিং ছেড়ে এখানে কথা বলতে এলাম। আপনাদের সমস্যা সমাধানের জন্যই এসেছি।” আশ্বাস পেয়ে ধীরে ধীরে বিক্ষোভকারী মহিলারা জেলাশাসকের অফিস থেকে বেরিয়ে যান।
অন্য দিকে, অন্নপূর্ণার টাকা না পেয়ে রেললাইনে বসে বিক্ষোভ দেখানো হয় উত্তর ২৪ পরগনার বিরাটিতে। মহিলাদের অবরোধের জেরে শুক্রবার এক ঘণ্টার বেশি লোকাল ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বিরাটি স্টেশনের শেষ প্রান্তে ফ্লাইওভারের তলায় জড়ো হয়েছিলেন কয়েকশো মহিলা। তাঁরা রেললাইনে নেমে পড়েন। এর জেরে হাসনাবাদ থেকে শিয়ালদহগামী ডাউন লোকাল ট্রেন দুপুর ১টা ৩৫ মিনিট নাগাদ বিরাটি স্টেশনে ঢোকার পর দাঁড়িয়ে যায়। তার পর একাধিক ট্রেন বিভিন্ন স্টেশনে দাঁড়িয়ে পড়ায় চরম ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়েছে যাত্রীদের। অবরোধকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভকারী মহিলা এবং ট্রেনযাত্রীদের মধ্যে তর্কাতর্কিও হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে বেগ পেতে হয় রেল পুলিশকে। ওই মহিলাদের অভিযোগ, অন্নপূর্ণা ভান্ডারের জন্য বারবার তথ্যপ্রমাণ যাচাই-সহ প্রয়োজনীয় সমস্ত নথি জমা দিয়েছেন। আবেদন অনুমোদিত (অ্যাপ্রুভ) দেখালেও এখনও তাঁদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা ঢোকেনি। অথচ বহু উপভোক্তা ইতিমধ্যেই টাকা পেয়ে গিয়েছেন। ফলে ক্ষোভ আরও বাড়ছে। এর আগে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন, ২০ তারিখের মধ্যে অন্নপূর্ণা ভান্ডারের টাকা উপভোক্তাদের অ্যাকাউন্টে পৌঁছে যাবে। কিন্তু সেই সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও পাননি। মহিলাদের দাবি, যোগ্য সকল উপভোক্তাকেই টাকা দিতে হবে। কাউকে বঞ্চিত করা যাবে না।
কলকাতার বুকেও অন্নপূর্ণা নিয়ে ক্ষোভের ছবি দেখা গিয়েছে শুক্রবার। উত্তর কলকাতায় ফুলবাগান থানার সামনে জড়ো হন মহিলারা। বেশ কিছু ক্ষণ বিক্ষোভ চলে। বেহালা চৌরাস্তায় জড়ো হন মহিলারা। তাঁদেরও একই অভিযোগ। যানজট শুরু হয়। পরে পুলিশ পরিস্থিতি সামলায়। সেখান থেকে বিডিও অফিসে চলে যান মহিলারা।
বিরাটির পাশাপাশি হাবড়াতেও রেললাইন অবরোধ করা হয়। একই সঙ্গে অন্নপূর্ণার টাকা না পেয়ে হাবড়া পুরসভাতেও বিক্ষোভ দেখান মহিলারা। তাঁরা কটাক্ষ করে বলেন, ”অন্নপূর্ণা যোজনার নাম বদলে ‘ঢুকেছে কি ঢোকেনি’ রাখুন।” হাবরা পুরসভার সামনে দাঁড়িয়ে বিক্ষোভরত মহিলারা অভিযোগ করেন, বার বার যাচাই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যাওয়ার পরেও তাঁরা টাকা পাননি। অন্নপূর্ণা ভান্ডারের জন্য কখনও সাইবার ক্যাফেতে গিয়ে ফর্ম পূরণ করেছেন, কখনও পুরসভা এবং বিভিন্ন দফতরে নথি জমা করেছেন। আবার কখনও বাড়িতে গিয়ে তথ্যযাচাইয়ের সময় যোগ্য প্রাপক হিসাবে নিজেদের প্রমাণ করেছেন। তার পরেও কেন বঞ্চনা? পুরসভায় গিয়ে তাঁরা টাকা না পাওয়ার কারণ জানতে চান। পুরসভার কাজকর্ম ব্যাহত হয়। মহিলাদের দাবি, ”যোগ্য সকল উপভোক্তাকে যদি টাকা দেওয়া হয়, তা হলে সবাইকে একসঙ্গে টাকা দেওয়া হোক। আর যদি কোনও সমস্যা বা তথ্যযাচাই বাকি থাকে, তা হলে আগে সেই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করে টাকা দেওয়া হোক।” হয়রানির পরেও টাকা না পাওয়ায় সরকারি গাফিলতিকে দায়ী করছেন তাঁরা।
একই ছবি হুগলিতেও। অন্নপূর্ণার টাকা পাননি বলে চণ্ডীতলা-২ বিডিও অফিসে বিক্ষোভ দেখান মহিলারা।
অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা না পেয়ে শুক্রবার দুপুরে বিষ্ণুপুরের মহকুমাশাসকের দফতরে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন মহিলারা। মহকুমাশাসকের দফতরের সামনে রাস্তাও অবরোধ করে রাখেন তাঁরা। পরে বিষ্ণুপুর থানার পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে। যদিও বিক্ষোভকারীদের হুঁশিয়ারি, আর কয়েক দিনের মধ্যে টাকা না পেলে ‘বৃহত্তর আন্দোলন’ করবেন তাঁরা। শুক্রবারই বাঁকুড়ার বড়জোড়া বিডিও অফিসে বিক্ষোভ দেখান বেশ কয়েক জন মহিলা। বাঁকুড়া-দুর্গাপুর রাজ্য সড়কও অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল।
পুরুলিয়া শহরে দু’টি রাস্তা অবরোধ করেন মহিলারা। শহরের দুলমী এলাকায় এবং পুরুলিয়া শহরের রেনি রোড অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। অবরোধকারীরা দাবি করেন ন্যায্য প্রাপক হওয়া সত্ত্বেও তাঁদের অ্যাকাউন্টে অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা ঢোকেনি। অনলাইন এবং অফলাইন উভয় মাধ্যমেই তাঁরা আবেদন করেছিলেন। পথ অবরোধের কারণে প্রচুর গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ে। ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ মানুষ। পরে পুলিশ সকলকে সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়ে পুরুলিয়া পুরসভায় যেতে বলেন। সেখানে এখনও আলোচনা চলছে।
অন্নপূর্ণা ভান্ডারের টাকা না পেয়ে হরিশ্চন্দ্রপুর-১ নম্বর ব্লক দফতরে হুলস্থুল পরিস্থিতি। ‘যোগ্য উপভোক্তা’ হয়েও টাকা না মেলায় হতাশ মহিলারা প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। শুক্রবার দুপুরে হরিশ্চন্দ্রপুরের বিভিন্ন এলাকার মহিলারা ব্লক অফিসে ভিড় জমান। যাঁরা এখনও পর্যন্ত অন্নপূর্ণা ভান্ডারের টাকা পাননি, তাঁদের অভিযোগ বারবার সমস্ত রকম তথ্য দিয়ে সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী ফর্ম পূরণ করার পরেও তাঁদের অ্যাকাউন্টে ৩ হাজার টাকা ঢোকেনি।
অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা না পেয়ে ধূপগুড়িতে জাতীয় সড়ক অবরোধ করেন প্রায় দুশো মহিলা। শুধু তা-ই নয়, বিডিও অফিসে গিয়েও বিক্ষোভ দেখান তাঁরা। প্রথমে ধূপগুড়ি থেকে ফালাকাটাগামী ৩১ নম্বর জাতীয় সড়ক অবরোধ করেন মহিলারা। অভিযোগ, ক্ষমতায় আসার আগে বিজেপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রাপকেরা তিন হাজার টাকা করে পাবেন। ভোটের পর তাঁদের শর্ত দেওয়া হয়েছে। তার পরেও হয়রানি। যোগ্য উপভোক্তা হয়েও কেন টাকা মিলল না, তা নিয়ে সরকারের কাছে জবাব চাইছেন তাঁরা। অবরোধ তুলতে গেলে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের ধস্তাধস্তির পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় সেখানে।
মালদহে পুরসভায় দীর্ঘ লাইন ও স্বজনপোষণের অভিযোগ
একই উত্তপ্ত ছবি ধরা পড়েছে মালদহের ইংলিশবাজার পুরসভাতেও। অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা না পেয়ে শতাধিক মহিলা পুরসভা চত্বরে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। তাঁদের অভিযোগ, পরিবারের আর্থিক অবস্থা খারাপ থাকা সত্ত্বেও অহেতুক ও অযৌক্তিকভাবে তাঁদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তিনটির বেশি ঘর থাকার বাহানায় আবেদন খারিজ করা হলেও, যৌথ ও বড় পরিবারের ক্ষেত্রে সেই নিয়ম প্রয়োগ করা অত্যন্ত অন্যায় বলে দাবি করেন বিক্ষোভকারীরা। দিনের পর দিন দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে বলে তীব্র ক্ষোভ উগরে দেন তাঁরা।
বনগাঁয় পথ অবরোধ ও বোলপুরে এসডিও দফতর ঘেরাও
উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁ পুরসভার সামনে মূল রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখান স্থানীয় মহিলারা। একাধিকবার সঠিকভাবে ফর্ম জমা দেওয়া সত্ত্বেও ভাতার টাকা অ্যাকাউন্টে জমা না পড়ায় ক্ষুব্ধ মহিলারা স্পষ্ট জানান, যোগ্য উপভোক্তাদের টাকা দ্রুত মিটিয়ে দিতে হবে, অন্যথায় এই প্রকল্পের সুবিধা সবার জন্যই বন্ধ করতে হবে।
















































